Translate

শনিবার, ৫ এপ্রিল, ২০১৪

সাংবাদিক ও ভাষাসৈনিক সৈয়দ মোস্তফা জামাল স্মরণে



ভাষা সৈনিক, প্রচার বিমুখ প্রয়াত সাংবাদিক, সমাজসেবক ছৈয়দ মোস্তফা জামাল ২০০৪ সালের ২২ এপ্রিল আমাদের শোক সাগরে ভাসিয়ে চিরতরে চলে গেলেনআমি তাহার ৮ম মৃত্যু বার্ষিকীতে রূহের মাগফেরাত কামনা করছিআল্লাহ যেন তাকে ক্ষমা বেহেসত্ম নসিব করুন  ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতির সাবেক কর্মকতা পটিয়া উপজেলার শোভন দন্ডীর প্রয়াত শিক্ষাবিদ কবি ওয়ালি মিঞা মাষ্টার চট্টগ্রাম সমিতি সৈয়দ মোস্তফা জামাল কে   নিয়ে  কবিতা লিখেছেন

ছৈয়দ মোসত্মফা জামাল খাটেন বহুতর,
সমিতির কাজে তিনি যান ঘরে ঘর
সেক্রেটারীর গুরম্নভার তিনি বহন করে,
দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি চার সর ধরে
সমাজকর্মী ছৈয়দ ছোলতান, জামাল তাঁর ছেলে
বসতি দেখবেন আছে মির্জাখীলে গেলে,
প্রাথমিক শিক্ষকদের খেদমত করিয়া
সত্তর বছর বয়স তাঁর গেল কাটিয়া
জনাব ছোলতানের ছিল পর হিতে মন,
তাইত জামাল পিতারমত সমাজকর্মী হন


সৈয়দ মোস্তফা জামালের পেশা সাংবাদিকতা হলেও পেশাকে পরিপূর্ণভাবে আর্তমানবতার সেবায় তিনি কাজে লাগানসাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজ সেবার জন্য যুগ যুগ ধরে সৈয়দ মোস্তফা জামাল মানুষের অন্তরে বেঁচে থাকবেন সাংবাদিকতা নিষ্ঠার সাথে সমাজসেবার কারণে আর্থিক টানা পোড়নের জন্য তিনি কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে যেতে পারেননি মানুষের জন্য যথাসাধ্য কল্যাণ করার আজীবন চেষ্টা করেছেনতিনি বলতেন, ‘‘বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের সমস্যাদি চিহ্নিত, তাদের বক্তব্য সংবাদপত্রের মাধ্যমে সমাজে তুলে ধরা সম্ভব হলে মহান আলস্নাহর নিকট সওয়াব রহমত পাওয়া যায়’’

প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতা একটি মহ সম্মানী পেশাযার আসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমসত্ম প্রাণীকুলের সমস্যাদি চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরাদেশ জাতির প্রতি কর্তব্য পরায়নতা, রাজনৈতিক পরিমন্ডলে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে কর্তব্যের প্রতি সচেতন রাখার জন্য, রবুরিয়ত কায়েম, সর্বোপরি স্বীয় পিতার আদর্শ অনুকরণে জাতীয় রাজনীতির সাথেও সৈয়দ মোস্তফা জামাল সংশ্লিষ্ট ছিলেনমাওলানা ভাসানীর পথ ধর, রবুবিয়ত কায়েম করার শেস্নাগানে উজ্জীবিত ছিলেন আজীবনতিনি ন্যাপ(ভাসানীর)বিভিন্ন পদে দীর্ঘ সময় সক্রিয় দায়িত্ব পালন করেন

ছৈয়দ মোস্তফা জামাল আত্নজীবনী লিখেন ১৯৯৭ সালেভূমিকায় লিখা ছিলেন নিম্মরূপঃ সকল প্রশংসা আলস্নাহ্‌তালারলাখ লাখ দরুদ সালম সর্বশেষ সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ মোসত্মফা (সঃ) এর প্রতিআলস্নাহ্‌্‌ সকলের গুনাহ্‌ মাফ করম্নন এবং আমরা যেন প্রত্যেকে প্রত্যেকের হক আদায় করি এবং মাফ করে দেয়ার তওফিক দিনআমিনতার পূর্ব পুরুষ সৗদি আরব,ইরাক, তুরস্ক,আফগানিসত্মান হয়ে দিলস্নী  ঢাকায় বসবাস করতেনদিলস্নীর বাদশাহ্‌ জাহাঙ্গীরের আমলে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামে হযরত কাতাল পীর শাহ্‌ (রঃ) এর প্রতিষ্ঠিত মসজিদ, মাদ্রাসা সমাজ কল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে জনসেবার জন্য তাঁর পূর্ব পুরুষ লাখরাজ সম্পত্তি লাভ করেন

সাংবাদিক সমাজসেবক সৈয়দ মোস্তফা জামাল জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালের জানুয়ারী সোমবার পবিত্র রমজান মাসেতার দাদা ছৈয়দ আলিম উলস্নাহ্‌ শাহ্‌ ভারতীয় উপমহাদেশ ্‌ আরাকানে ইসলাম প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেনতিনি খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং বিখ্যাত ছৈয়দ আহমদ বেরেলভীর অনুসারীদের সাথে পবিত্র হজ্ব আদায় করেন

তাঁর বাবা ছিলেন কোলকাতাস' নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির প্রথম সাধারণ সম্পাদক বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের কারাবরণকারী নেতা মরহুম আলহাজ্ব মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদ

১৯৫১ সালে সৈয়দ মোসত্মফা জামাল তমদ্দুন মজলিশের বৃহত্তম সাতকানিয়া থানার সাধারণ সম্পাদক নিবার্চিত হন সর সাতকানিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদক পদেও তিনি নির্বাচিত হন১৯৫১ সালে ঢাকার ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক এর সাতকানিয়া প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন

১৯৫২ সালে বৃহত্তর সাতকানিয়া থানার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আন্দোলনের আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন সময় ব্যাপক মিছিল সভা, অবরোধ কর্মসূচী পালন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা এর পক্ষে সক্রিয় প্রচার চালানসাতকানিয়ার আহবায়ক হিসেবে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এপ্রিল মাসে ঢাকায় ভাষা সম্মেলনে অংশ নেন সময় তখনকার সদস্য কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে চট্টগ্রামসহ ভাষা আন্দোলন বিষয়ে মত বিনিময় করেনএই সালে শেরে বাংলা .কে. ফজলুল হক চট্টগ্রামে পূর্ব পাকিসত্মান প্রাথমিক শিক্ষক সম্মেলন উদ্বোধন করেনসম্মেলনের সংগঠক পিতা মৌলভী ছৈয়দ ছোলতান আহমদের সাথে তিনি সর্বক্ষন কাজ করেন

সৈয়দ মোস্তফা জামাল ১৯৫৪ সালে জেলা যুক্ত ফ্রন্ট কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হনপ্রচার সম্পাদক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক ডঃ মাহফুজুল হকমরহুম ডঃ মাহফুজুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালে শেরে বাংলার সাথে সাক্ষা করে চট্টগ্রাম থেকে একজন মন্ত্রী নিতে অনুরোধ করেন১৯৫২ সালে দৈনিক আজান, ১৯৫৩ সালে দৈনিক সংবাদ, ১৯৫৪ সালে ঢাকায় দৈনিক মিলস্নাত সপ্তাহিক সৈনিক সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন১৯৫৮ সালে দৈনিক ইত্তেফাক দৈনিক নাজাত, ১৯৫৯ সালে দৈনিক ইত্তেহাদ,দৈনিক পয়গামের সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন১৯৭২ সালে দৈনিক স্বদেশ এর বার্তা সম্পাদক বার্তা সংস্থা সি.পি. আই দৈনিক ইত্তেফাকে
কাজ করেন১৯৫৭ সালে তিনি পাকিসত্মান কিশোর মজলিশ গঠন করেনমওলানা মোহাম্মদ বজলুল রহিম, শিল্পী হাসান রেজা, ডাঃ ফখরুল ইসলাম চৌধুরী, ব্যাংকার .কে.এম মহিউদ্দিন খোকন ঐকমিটির সাথে যুক্ত ছিলেনতিনি ১৯৬০ সালে দৈনিক আজাদীর ঢাকা ব্যুরো প্রধান নিযুক্ত হন সময় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সংবাদদাতা ইউনিটের উপ প্রধান ছিলেনসাংবাদিক হিসেবে ১৯৬২ সালে পাকিসত্মানের রাওয়াল পিন্ডিতে কালীন পাকিসত্মানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খাঁনের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং পাক-ভারতের বিরোধপূর্ণ এলাকা মারি, মোজাফ্‌ফারাবাদ কাশ্মীর সফর করেন১৯৬৫ সালে পাকিসত্মানের লাহোরে সমাজ সেবা সম্মেলনে অংশ নেন১৯৬৭ সাল থেকে দফায় ঢাকাস' চট্টগ্রাম সমিতির সাধারন সম্পাদক ছিলেনমুক্তিযুদ্ধকালে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ থাকায় তিনি প্রথমে রংপুরের বুড়িমারি সীমানত্মপথে ভারতের দড়্গিণ ২৪পরগণা জেলা,কোলকাতা এবং মেঘালয় রাজ্যে এবং আগরতলায় অবস' করেন

সৈয়দ মোস্তফা জামাল ছিলেন নিরহংকার নিবেদিতপ্রাণ বিরল সমাজসেবী, জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নুরুল ইসলাম তাঁর সময়ে চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতির পদ অলংকৃত করেনঢাকাস' যক্ষ্মা সমিতিরও কার্যকারী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামে সাতকানিয়া কচি কাঁচার মেলা গঠন করেন৭৪ সালে এর সম্মেলন হয়১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বতারায় যোগ দেন
১৯৮০ সালে অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব নির্বাচিত হন সময় মাওলানা ইসলামাবাদী একাডেমী গঠিত হলে ব্যারিষ্টার বজলুস সাত্তার সভাপতি, মোস্তফা জামাল সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটির উদ্যোক্তা পরিচালক নির্বাচিত হন

তিনি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) সদস্য, দৈনিক পূর্বতারার সাবেক বার্তা সম্পাদক ছিলেনতিনি সাতকানিয়া সাহিত্য বিশারদ কচি কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকবাংলাদেশ সীরাত মিশন চট্টগ্রাম জেলা শাখার সভাপতি,বিচারপতি আমীরম্নল কবির চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজ কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি১৯৬০ সাল থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেনতিনি ঢাকার বাংলা কলেজের গভর্নিং বড়ির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যকবি কায়কোবাদ সাহিত্য মজলিশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাতিনি আলেমা খাতুন ভাসানীর নেতৃত্বধীন ন্যাপ ভাসানীর সাবেক কেন্দ্রীয় শিক্ষা সাংস্কৃতিক সম্পাদকচট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক, প্রাচীণ সমাজ উন্নয়ন সঙগঠন বাংলাদেশ সমাজ কল্যাণ সমিতি(বিএসকেএস) সহ-সভাপতি,সাধারণ সম্পাদক, চকবাজার আজিজুর রহমান জনকল্যাণ পরিষদ, সমাজ কল্যাণ ত্রাণ কমিটি, অপরাধী সংশোধন সংস', আলহাজ্ব নুর মোহাম্মদ সওদাগর আলকাদেরী (রঃ) স্মৃতি সংসদের সদস্য, ডঃ মাহফুজুল হক স্মৃতি সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি, কবি আলাদীন আলীনুর সাহিত্য সংসদের সম্পাদক, বাংলাদেশ দ্বীনি একাডেমী এবং খোলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়াত সদস্য ছিলেনমৃত্যুর পূর্ব পর্যনত্ম তিনি মাওলানা মনিরম্নজ্জান ইসলামাবদী গবেষণা একাডেমীর সভাপতি ছিলেনতিনি শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম, মঘীস্থানে (দক্ষিণ চট্টগ্রাম) ইসলাম প্রচার, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ডক্টর এম মাহফুজূল হক পুস্তকের লেখকতিনি ২০০১ সালে শেরে বাংলা জাতীয় পুরষ্কার লাভ করেনএকই সালে ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতি, সমিতিতে অসমান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সমিতির সম্মাননা পদক লাভ করেন

সাংবাদিকতায় কৃতিত্ব পূর্ণ অবদানের জন্য ২০০১ সালে বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি তাঁকে স্বর্ণ পদকে ভুষিত করেন, ২০১০ সালে মরনত্তোর সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমদ পদক পানতিনি ১৯৯১ সালে ন্যাপ ভাসানীর পক্ষে চট্টগ্রাম মহানগর (চট্ট- ), ১৯৯৬ সালে চন্দনাইশ ২০০১ সালে সাতকানিয়া- লোহাগাড়া আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনসাংবাদিকতা জীবনে তিনি অসংখ্যবার প্রেস ইনষ্টিটিউটের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেনপ্রবীণ বয়সেও প্রশিক্ষণে অংশ নিতে দ্বিধা করতেন না২০০৩ সালের প্রথম দিনে উচ্চরক্ত চাপ, জ্বর, ডায়াবেটিস, প্রষ্টেট ্লান্ডের আকৃতি বড় হওয়া ইত্যাদি রোগের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হনদীর্ঘ আড়াই মাস হাসপাতালে কাটিয়ে বাসায় ফিরলেও প্রচন্ড শারীরিক দুর্বলতার কারণে শয্যাশায়ী থেকে যানতখন আর সভা-সমাবেশে যেতে পারেন নিটানা বছর মাস ১১ দিন চট্টগ্রাম শহরের পাঠানটুলীস্থ বাসভবনে চিকিসাধীন থাকার পর তিনি ২২ এপ্রিল ২০০৪ বৃহস্পতিবার রাত টা মিনিটে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন

মহান আলস্নাহতায়ালা তাকে বেহেস্ত নসিব করুনআমিন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন